• মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
র‌্যাবের উপর মার্কিনী নিষেধাজ্ঞা
র‌্যাবের উপর মার্কিনী নিষেধাজ্ঞা

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

র‌্যাবের উপর মার্কিনী নিষেধাজ্ঞা

১০ ডিসেম্বর’২১-এ খবরে প্রকাশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ ও পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) এবং সংস্থাটির বর্তমান ও সাবেক ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে যাদের পাসপোর্টে মার্কিন ভিসা ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে এবং যারা ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তারা মার্কিন ভিসা পাবেন না। তারা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন না। এই ৭ কর্মকর্তা ছাড়াও র‌্যাবের সাথে যুক্ত নয়, সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল আজিজের মার্কিন ভিসাও বাতিল করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। ৭ কর্মকতার মধ্যে আছেন র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমানে পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদসহ অন্যান্যরা। যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা ও কালোতালিকার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বাংলাদেশে র‌্যাব গঠনের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত গুরুতর মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে এসেছে গুম এবং ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা। এ তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ১২টি মানবাধিকার সংগঠন জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে আবেদন করেছে যে বিদেশে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনগুলোতে র‌্যাব-পুলিশের কাউকে যেন না নেওয়া হয়।  তাছাড়া স্লোভাকিয়ার ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট সদস্য ইভান স্টেফানেক গত ২০ জানুয়ারি  ইইউ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ বোরেলের কাছে এক চিঠিতে আইনের শাসন না থাকা, বিচারবর্হিভূত হত্যা এবং দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলো উল্লেখ করে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করেন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাব-কমিটির সদস্য স্টেফানেক বাংলাদেশে মানবাধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হওয়ার কারণে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে সহায়ক ভূমিকার আহ্বান জানান।  তারা বলেছেন, বাংলাদেশের বহু নাগরিক নিখোঁজ - এই সংখ্যা ৫ শতাধিক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলে মুক্তভাবে কথা বলার স্বাধীনতার কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছে। অনলাইনে ভিন্ন মতাবলম্বীদের অপরাধী বানানো হয়েছে এবং লঙ্ঘন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ১,১৩৪টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-র কথাও তারা বলেছেন।

এই নিষেধাজ্ঞা জানার পর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী, সাংসদ এবং বিভিন্ন স্তরের আওয়ামী নেতারা প্রথমে তাদের ভাষায় “চোরের মায়ের বড় গলা নিত্য খায় দুধ-কলা” উপমার মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাছায় কত সংখ্যক ফুটো আছে তা তুলে ধরে। এই ফুটো নিয়ে তাদের মুখে বাংলাদেশ সরকারের মানবাধিকার লংঘনের কথা শোভা পায় না - এমন মন্তব্য করেছেন তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন - র‌্যাব কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র শিখিয়েছে। কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা থাকলে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে পারে। তারা বলে এই র‌্যাব-কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য প্রশিক্ষণ দিয়ে ২০০৪ সালে বিএনপি আমলে গঠন করেছিল। র‌্যাব কোনো মানবাধিকার লংঘনের মত কাজ করেনি। বরং জঙ্গীবাদ দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে - ইত্যাদি।  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘আমরা সব সময় বলি, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। যেখানেই গুম হচ্ছে, সেখানেই আমরা কিছুদিন পরেই তাকে পাচ্ছি। নানা কারণে আত্নগোপন করে থাকে, সেগুলো গুম বলে চালিয়ে দেয়। বাংলাদেশে কেউ গুম হয় না।’ মন্ত্রীরা আরো বলেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ও হয় না। র‌্যাব-পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়ে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হয় - ইত্যাদি।

সরকারের মন্ত্রীরা উপরোক্ত গলাবাজি করলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেন এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তারা তা ঠিকই বোঝে। তারা বোঝে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সঠিক। বরং অপরাধ আরো অনেক বেশি। কিন্তু এতোদিন এসব নিয়ে প্রশ্ন না তুলে এখন কেন হচ্ছে? আসলে এসবকে ব্যবহার করে সরকারকে চাপে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, বাংলাদেশের কাছে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক তথা ভূ-রাজনৈতিক বিশেষ সুবিধা আদায় করে নিতে চাইছে। বুর্জোয়া মানবাধিকার সংস্থাগুলো তারই সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে। তাই পররাষ্ট্র সচিব শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘মার্চ-এপ্রিল’২২-এ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক রয়েছে। বাড়তি ইস্যু হিসেবে নিষেধাজ্ঞা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এটা এখন আমাদের টপ ইস্যু। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘১০ ডিসেম্বরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আমরা অনেক কিছুই করেছি বা করছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ২০২৬ সালের পরে ইইউর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’ চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যবিরোধের পর রাজনৈতিক বিরোধও শুরু হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তাজনিত কৌশলের বিপরীতে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী অবস্থান। চীনের বিরুদ্ধে মার্কিনের নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ হচ্ছে আরেকটি সামরিক জোট। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশকে তাতে যুক্ত করতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। বিবিধ কারণে তা যুতসই হচ্ছে না। বাংলাদেশ চীনকে অসন্তুষ্ট করতে চায় নি। এ কারণে তাতে সাড়া দেয়নি। পদ্মসেতুর অর্থায়নের বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে হাসিনা সরকারের বিরোধ হলে তারা চীনের সাথে চুক্তি করে পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন মেগাপ্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছে। বাংলাদেশে চীন বিপুল বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ৫ শতাংশ চীনের। গত ১১ মার্চ জাপানের পত্রিকা নিক্কেই এশিয়ার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপ করা যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। ২০১১ সালে বাংলাদেশের কাছে চীনের সরবরাহ করা ‘সারফেস টু এয়ার মিসাইল’ নামে পরিচিত বিমান-বিধ্বংসী মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তুতির বিষয়টি ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। যদিও চীন বলছে ‘বাংলাদেশ সহ  বিদেশের কোনো ভূখ-ে চীন সামরিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে না। যদি তেমন কিছু হয়ে থাকে, সেটা বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে মেরামত কারখানা কিংবা তেমন কিছু একটা হতে পারে।’ নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের স্থাপনা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। এই সমস্ত কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র দেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশের উপর অসন্তুষ্ট। তাই বাংলাদেশকে চাপে রেখে তাদের সাম্রাজ্যবাদী অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য এই নিষেধাজ্ঞাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং মানবাধিকারের বড় বড় বুলি কপচাচ্ছে। আর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার নিজের অপরাধকে ঢাকার জন্য মিথ্যাচার করছে। একই সাথে মার্কিন মহলকে খুশি রাখার জন্য সরকারি অর্থে লবিস্ট নিয়োগসহ তাদেরকে তেল মাখাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকশ্রেণি তাদের অভিন্ন স্বার্থে ২০০৪ সালে বিএনপি শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশনে র‌্যাব প্রতিষ্ঠা করেছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল এদেশের মাওবাদী বিপ্লবী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধ্বংস করা। এই র‌্যাব মাওবাদী বহু নেতা-কর্মীদের হত্যা করেছে। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসবাদী সরকার বিএনপি আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরোধিতা করলেও তারাই ক্ষমতায় এসে মাওবাদীদের হত্যা তো করেছেই, উপরন্তু তাদের বুর্জোয়া প্রতিপক্ষ এবং সামাজিক ছোট-খাটো অপরাধীদের বেঘোরে ক্রসফায়ারে হত্যা করে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে বলে হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ন্যায়সঙ্গত হবে না। সাম্রাজ্যবাদ এবং দালালরা অপরাধ করে তাদের শ্রেণি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে। বৃহত্তর স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদ তাদের দালালদের ক্ষুদ্র অংশকে বলিও দিতে পারে এবং দেয়। বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে তেমনি একটি বিষয়।  তাই, বাংলাদেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদ এবং তার দালাল শাসকশ্রেণি, বিশেষত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারকে উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে সকল ধরনের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

র‌্যাবের উপর মার্কিনী নিষেধাজ্ঞা

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

র‌্যাবের উপর মার্কিনী নিষেধাজ্ঞা

১০ ডিসেম্বর’২১-এ খবরে প্রকাশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ ও পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) এবং সংস্থাটির বর্তমান ও সাবেক ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে যাদের পাসপোর্টে মার্কিন ভিসা ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে এবং যারা ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তারা মার্কিন ভিসা পাবেন না। তারা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন না। এই ৭ কর্মকর্তা ছাড়াও র‌্যাবের সাথে যুক্ত নয়, সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল আজিজের মার্কিন ভিসাও বাতিল করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। ৭ কর্মকতার মধ্যে আছেন র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমানে পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদসহ অন্যান্যরা। যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা ও কালোতালিকার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বাংলাদেশে র‌্যাব গঠনের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত গুরুতর মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে এসেছে গুম এবং ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা। এ তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ১২টি মানবাধিকার সংগঠন জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে আবেদন করেছে যে বিদেশে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনগুলোতে র‌্যাব-পুলিশের কাউকে যেন না নেওয়া হয়।  তাছাড়া স্লোভাকিয়ার ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট সদস্য ইভান স্টেফানেক গত ২০ জানুয়ারি  ইইউ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ বোরেলের কাছে এক চিঠিতে আইনের শাসন না থাকা, বিচারবর্হিভূত হত্যা এবং দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলো উল্লেখ করে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করেন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাব-কমিটির সদস্য স্টেফানেক বাংলাদেশে মানবাধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হওয়ার কারণে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে সহায়ক ভূমিকার আহ্বান জানান।  তারা বলেছেন, বাংলাদেশের বহু নাগরিক নিখোঁজ - এই সংখ্যা ৫ শতাধিক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলে মুক্তভাবে কথা বলার স্বাধীনতার কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছে। অনলাইনে ভিন্ন মতাবলম্বীদের অপরাধী বানানো হয়েছে এবং লঙ্ঘন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ১,১৩৪টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-র কথাও তারা বলেছেন।

এই নিষেধাজ্ঞা জানার পর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী, সাংসদ এবং বিভিন্ন স্তরের আওয়ামী নেতারা প্রথমে তাদের ভাষায় “চোরের মায়ের বড় গলা নিত্য খায় দুধ-কলা” উপমার মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাছায় কত সংখ্যক ফুটো আছে তা তুলে ধরে। এই ফুটো নিয়ে তাদের মুখে বাংলাদেশ সরকারের মানবাধিকার লংঘনের কথা শোভা পায় না - এমন মন্তব্য করেছেন তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন - র‌্যাব কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র শিখিয়েছে। কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা থাকলে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে পারে। তারা বলে এই র‌্যাব-কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য প্রশিক্ষণ দিয়ে ২০০৪ সালে বিএনপি আমলে গঠন করেছিল। র‌্যাব কোনো মানবাধিকার লংঘনের মত কাজ করেনি। বরং জঙ্গীবাদ দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে - ইত্যাদি।  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘আমরা সব সময় বলি, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। যেখানেই গুম হচ্ছে, সেখানেই আমরা কিছুদিন পরেই তাকে পাচ্ছি। নানা কারণে আত্নগোপন করে থাকে, সেগুলো গুম বলে চালিয়ে দেয়। বাংলাদেশে কেউ গুম হয় না।’ মন্ত্রীরা আরো বলেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ও হয় না। র‌্যাব-পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়ে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হয় - ইত্যাদি।

সরকারের মন্ত্রীরা উপরোক্ত গলাবাজি করলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেন এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তারা তা ঠিকই বোঝে। তারা বোঝে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সঠিক। বরং অপরাধ আরো অনেক বেশি। কিন্তু এতোদিন এসব নিয়ে প্রশ্ন না তুলে এখন কেন হচ্ছে? আসলে এসবকে ব্যবহার করে সরকারকে চাপে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, বাংলাদেশের কাছে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক তথা ভূ-রাজনৈতিক বিশেষ সুবিধা আদায় করে নিতে চাইছে। বুর্জোয়া মানবাধিকার সংস্থাগুলো তারই সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে। তাই পররাষ্ট্র সচিব শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘মার্চ-এপ্রিল’২২-এ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক রয়েছে। বাড়তি ইস্যু হিসেবে নিষেধাজ্ঞা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এটা এখন আমাদের টপ ইস্যু। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘১০ ডিসেম্বরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আমরা অনেক কিছুই করেছি বা করছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ২০২৬ সালের পরে ইইউর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’ চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যবিরোধের পর রাজনৈতিক বিরোধও শুরু হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তাজনিত কৌশলের বিপরীতে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী অবস্থান। চীনের বিরুদ্ধে মার্কিনের নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ হচ্ছে আরেকটি সামরিক জোট। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশকে তাতে যুক্ত করতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। বিবিধ কারণে তা যুতসই হচ্ছে না। বাংলাদেশ চীনকে অসন্তুষ্ট করতে চায় নি। এ কারণে তাতে সাড়া দেয়নি। পদ্মসেতুর অর্থায়নের বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে হাসিনা সরকারের বিরোধ হলে তারা চীনের সাথে চুক্তি করে পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন মেগাপ্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছে। বাংলাদেশে চীন বিপুল বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ৫ শতাংশ চীনের। গত ১১ মার্চ জাপানের পত্রিকা নিক্কেই এশিয়ার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপ করা যায়, এমন ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। ২০১১ সালে বাংলাদেশের কাছে চীনের সরবরাহ করা ‘সারফেস টু এয়ার মিসাইল’ নামে পরিচিত বিমান-বিধ্বংসী মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তুতির বিষয়টি ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। যদিও চীন বলছে ‘বাংলাদেশ সহ  বিদেশের কোনো ভূখ-ে চীন সামরিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে না। যদি তেমন কিছু হয়ে থাকে, সেটা বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে মেরামত কারখানা কিংবা তেমন কিছু একটা হতে পারে।’ নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের স্থাপনা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। এই সমস্ত কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র দেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশের উপর অসন্তুষ্ট। তাই বাংলাদেশকে চাপে রেখে তাদের সাম্রাজ্যবাদী অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য এই নিষেধাজ্ঞাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং মানবাধিকারের বড় বড় বুলি কপচাচ্ছে। আর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার নিজের অপরাধকে ঢাকার জন্য মিথ্যাচার করছে। একই সাথে মার্কিন মহলকে খুশি রাখার জন্য সরকারি অর্থে লবিস্ট নিয়োগসহ তাদেরকে তেল মাখাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকশ্রেণি তাদের অভিন্ন স্বার্থে ২০০৪ সালে বিএনপি শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশনে র‌্যাব প্রতিষ্ঠা করেছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল এদেশের মাওবাদী বিপ্লবী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধ্বংস করা। এই র‌্যাব মাওবাদী বহু নেতা-কর্মীদের হত্যা করেছে। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসবাদী সরকার বিএনপি আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরোধিতা করলেও তারাই ক্ষমতায় এসে মাওবাদীদের হত্যা তো করেছেই, উপরন্তু তাদের বুর্জোয়া প্রতিপক্ষ এবং সামাজিক ছোট-খাটো অপরাধীদের বেঘোরে ক্রসফায়ারে হত্যা করে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে বলে হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ন্যায়সঙ্গত হবে না। সাম্রাজ্যবাদ এবং দালালরা অপরাধ করে তাদের শ্রেণি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে। বৃহত্তর স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদ তাদের দালালদের ক্ষুদ্র অংশকে বলিও দিতে পারে এবং দেয়। বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে তেমনি একটি বিষয়।  তাই, বাংলাদেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদ এবং তার দালাল শাসকশ্রেণি, বিশেষত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারকে উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে সকল ধরনের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র